চিলা রায়, চিলারায়, Chilarai

বিশ্ববীর চিলা রায় এর জীবন গাঁথা

Spread the love

বিশ্ববীর চিলা রায়

 

চিলা রায় – বিখ্যাত ঐতিহাসিক Arnold joseph toynbee যাঁকে নেপোলিয়ন এবং  শিবাজীর সঙ্গে তুলনা করে বিশ্ববীর এর আখ্যা দিয়েছিলেন সেই বীর চিলা রায় সম্পর্কে মানুষ তেমন কিছুই জানে না। 

চিলা রায়, চিলারায়, Chilarai

আসলে এতে দোষ মানুষের নয়, দোষ আমাদের সরকারের যাঁরা কোনও কারণ ছাড়াই চিলা রায়কে যোগ্য সম্মান দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। যে ভারতবর্ষের ইতিহাসে শয়তান মীরজাফর-ঘষেটিবেগম কিংবা ঔরঙ্গজেব সম্মানের সঙ্গে স্থান পান সেই ভারতের ইতিহাসের পাতায় কেন এমন মহান বীর চিলা রায় তেমন ভাবে স্থান পেলেন না তা মানুষের কাছে সত্যিই বিস্ময়কর। যাইহোক আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করছি চিলা রায়ের কিছু ঐতিহাসিক গাঁথা আপনাদের সামনে তুলে ধরার।

চিলা রায় এর জন্ম ও শিক্ষা গ্রহণ 

 

চিলারায়ের জন্ম হয় ১৫১০ সনে । কোচ রাজ্যের প্ৰতিষ্ঠাতা বিশ্ব সিংহের ১৯ জন স্ত্রী ছিল। জ্যেষ্ঠ স্ত্রী নেপালের গরাকী। তাঁর পুত্ৰ নরসিংহ। গৌড়ের দুজন স্ত্রী ছিল: হেমপ্ৰভা ও পদ্মাবতী দেবী । নরনারায়ণ ছিলেন হেমপ্ৰভার পুত্ৰ, আর  শুক্লধ্বজ ছিলেন পদ্মাবতীর পুত্ৰ । এই শুক্লধ্বজকেই চিলা রায় বলা হয় কারণ তিনি চিলের মতো (মতান্তরে ঘুড়ির মতো, অসমীয়া ভাষায় চিলা মানে ঘুড়ি। কামতাপুরি বা রাজবংশী ভাষায় চিলা মানে চিল) দ্রুত গতিতে যুদ্ধ করতেন।

Read more. :- কিভাবে ফেসবুক থেকে ইনকাম করা যায়   

নরনারায়ণ ও চিলারায় বারানসীতে ব্রহ্মানন্দ বিশারদ নামক সন্ন্যাসীর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। তারা বারানসী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সকল হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ও যুদ্ধ বিদ্যায় নিপুণ হয়েছিলেন।

বীর চিলা রায় এর জীবন গাঁথা

ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি দিল্লি কেন্দ্রিক সাম্ভ্রাজ্য বিস্তার এর মতই ছিল স্বাধীন সার্বভৌম কুচবিহারের সাম্রাজ্য বিস্তার । এই বিশাল সাম্রাজ্যের বিস্তারের প্রধান স্থপতি ছিলেন বিশ্ব মহাবীর চিলা রায়। কিন্তু চিলা রায় এই সাম্রাজ্যের রাজা ছিলেন না, রাজা ছিলেন অগ্রজ ভ্রাতা মহারাজা নরনারায়ন। 

ঋষি তুল্য ব্যক্তিত্ব মহারাজা নরনারায়ন তার রাজসভায় এত বিদ্বান শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের সমাবেশ ঘটিয়েছেন যে তসঁকে উওরপূর্ব ভারতের বিক্ৰমাদিত্য বলা হত। 

যদিও সত্যমিথ্যা জানার কোনও উপায় আজ আর নেই কিন্তু চিলা রায়ের বীরত্বের গাঁথায় কথিত আছে ঘোড়ায় চড়ে চিলা রায় ভরলা নদী লাফিয়ে পার হয়েছিলেন ।

 চিলা রায় রাজা না হয়েও রাজ্যের যুদ্ধ পরিচালনা থেকে শুরু করে রাজ্য জয়করা এবং প্রশাসনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ  দায়িত্ব পালন করতেন। 

সেনাপতি চিলা রায় তার অতুলোনিয় বীরত্ব ও রণকৌশলে প্রথমে আহম রাজ্য পরে মণিপুর, জয়ন্তীয়া, ত্রিপুরা, শ্রীহট্ট, কাছার, খসিয়া, ডিমরুয়া প্রভৃতি আরো অনেক রাজ্য জয় করে কুচবিহার রাজ্যের বস্যতা স্বীকার করান। 

“আকবরনামায়” এই সাম্রাজ্যে বিস্তারের কথাও উল্লেখ আছে । চিলা রায়ের অসীম বিরত্বের ভয়ে মোঘলরা কুচবিহার রাজ্যের কোনও ক্ষতি করতে পারে নাই। ফিরে যেতে হয়েছিল মোঘল দের। 

 

সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি পথঘাট নির্মাণ বৃক্ষরোপন পানিয় জলের ব্যবস্থা এবং জনহীতকর কাজেও বীর চিলারায় ছিলেন যত্নশীল । চিলা রায়ের জনহিত কর কাজের নিদর্শন আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে,- গুয়াহাটির মা কামাখ্যা মন্দির। 

কিন্তু সরকারের উদাসীনতায় চিলারায়ের বীরত্বের কাহিনি আজও ভারতের মানুষের কাছে অজানা। অথচ ঐতিহাসিক টয়েনবীর মতে বিশ্ব ইতিহাসে সমপর্যারে তিন বীরের আবির্ভাব হয়েছিল। চিলারায়, নেপোলিয়ন ও শিবাজী ।

কিন্তু সমর কুসলতা , মানসিক দৃঢ়তা, ও সাংগঠনিক দক্ষতার নিরিখে বিচার ,ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, কর্মতৎপরতা  উদ্দেশ্য, লক্ষ, সর্বোপরি মানব কল্যাণের জন্য নিষ্কাম কর্মমুখী ব্যক্তিত্বের নিরিখে বিচার করতে গেলে নেপোলিয়ন, ছত্রপতি শিবাজী ও চিলারায়কে এক সারিতে রাখা যায় না। 

কারন নেপোলিয়ন এর সমস্ত জয়ের একমাত্র উদ্দেশ্যছিল ক্ষমতার শীর্ষে আরহন এবং একছত্র সম্ভ্রাট হওয়া । শিবাজির উদ্দেশ্য ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের আন্ধকার ঘুচিয়ে একটি স্বাধীন হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠা। শিবাজী নিজেকে রামদাসজীর যোগ্য শিষ্য মনে করতেন। তিনি মনে করতেন প্রকৃত রাজা হচ্ছেন তার গুরুদেব তিনি তার প্রতিনিধি । অর্থাত তিনি রাজা হয়েও রাজা নন হিন্দু রাজ্যের একনিষ্ঠ সেবক মাত্র। 

কিন্তু অপরদিকে বীর চিলা রায়ের জীবনেও ক্ষমতালোভ ও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার কোন স্থান ছিল না। তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের একমাত্র উদ্দেশ্যছিল তার ধর্মপ্রাণ অগ্রজ ভ্রাতা নরনারায়নের প্রতি অকৃত্তিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা । এ যেন নিষ্কাম কর্মে অনুপ্রানিত মহাভারতের অর্জুন। কারন তিনি এত রাজ্য জয় করেছিলেন যে ইচ্ছা করলেই আগ্রজে সাথে কোনরকম বিরোধ ছাড়াই বিজীত রাজ্যের রাজা হতে পারতেন। 

কিন্তু তা না করে আদর্শ রাজধর্ম অনুসারে রাজার সহদর ভ্রাতা হয়েও সমস্ত সংকীর্ণতাকে সরিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলন একজন সুদক্ষ সেনাপতি । সকল ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ছিল তার ধর্মীয় ভাবনা। এখানেই চিলা রায়ের মহত্ত্ব । 

Read more:- জেনেনিন কেন লাইফ ইন্সুরেন্স করবেন  

তাই ঐতিহাসিক টয়েনবী সহ অনান্য ঐতিহাসিকগন চিলারায়েকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বীর তথা “বিশ্ব মহাবীর চিলা রায়” আখ্যা দেন।

চিলা রায়, চিলারায়, Chilarai

নৌবাহিনী ও গেরিলা যুদ্ধের পথ প্রদর্শক ছিলেন বিশ্ব মহাবীর চিলা রায়। 

দু:খের বিষয় কোনো অজানা কারণে ভারতের পাঠ্য ইতিহাসে বীর চিলা রায়কে স্থান দেওয়া হয়নি । তাই আজকের প্রজন্ম উনার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না।  আজ চিলা রায়ের ৫১১ তম জন্মবার্ষিকীর সম্মুখে দাঁড়িয়ে সরকারের কাছে আন্তরিক ভাবে অনুরোধ করতে ইচ্ছে করে, বিশ্ববীর চিলা রায়কে সম্মানের সঙ্গে ইতিহাসের পাতায় পাঠ্য করা হোক। এমন একজন বীরের কাহিনি জানাটাও গৌরবের।

বন্ধুরা লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করবেন। যাতে এই বীরের গল্প আরও মানুষ পড়ার সুযোগ পায়।  

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *